ইউকে সোমবার, ২৭ মে ২০২৪
হেডলাইন

সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরুই হয়নি

সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরুই হয়নি

ইউকে বাংলা অনলাইন ডেস্ক :সুনামগঞ্জের ইরি-বোরো ফসল রক্ষায় হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরুই হয়নি। প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ফসল রক্ষার জন্যে এবার প্রাথমিকভাবে ২০৩ কোটি টাকার প্রস্তাব করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবো। প্রস্তাবের বিপরীতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও ২৫ কোটি টাকা ছাড় দেয়া হয়। সময়মতো টাকা না পাওয়ায় কার্যাদেশের পরেও বহু জায়গায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) কাজও শুরু করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সুনামগঞ্জ পাউবোর (পওর বিভাগ-১) নির্বাহী প্রকৌশলী ও জেলা বাঁধ নির্মাণ, মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বাঁধের কাজ শতভাগ শুরু না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, নানা কারণে কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। দুয়েক দিনের মধ্যে পুরোপুরি শুরু হয়ে যাবে। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। পিআইসিকে প্রথম কিস্তির ২৫ কোটি টাকা দেয়া হয়। অনেকে প্রথম কিস্তির টাকা এখনো পাননি। চলতি সপ্তাহে আরও টাকা আসবে। তখন এক সাথে প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির টাকা দেয়া হবে। বাঁধের কাজের যথাযথ মনিটরিং করতে বিভিন্ন পেশাজীবীর সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রত্যেক বাঁধের কাজ সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। কোথাও কোনো অনিয়মের খবর পেলে পাউবো তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জানা গেছে, চলতি মৌসুমে (২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে) সুনামগঞ্জের বৃহৎ ৩৬ টিসহ ১৫৪টি হাওরের মোট ১ হাজার ৭১৮ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৭৪৫ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত ও ২১৮টি ক্লোজার নির্মাণ করবে পাউবো। এ জন্যে ১ হাজার ৭৮টি পিআইসি গঠন করা হয়। গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৭৮৬টি বাঁধের কাজ চলমান ছিল। বাকী ২৯২টি বাঁধের কাজ শুরুই করতে পারেনি।

পাউবোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৪১টি প্রকল্পের মধ্যে সবকটির কাজ শুরু হয়ে গেছে। বিশম্ভরপুর উপজেলার ৫৪টি প্রকল্পের মধ্যে শুরু হয়েছে ৫০টি প্রকল্পের কাজ। ধর্মপাশা উপজেলার ১২০টি প্রকল্পের মধ্যে ৭৫টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। মধ্যনগর উপজেলার ৪৮টি প্রকল্পের মধ্যে ৪২টির কাজ শুরু হয়েছে। তাহিরপুর উপজেলার ১১৩টি প্রকল্পের মধ্যে শুরু হয়েছে মাত্র ৪২টি প্রকল্পের কাজ। জামালগঞ্জ উপজেলার ৬১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৪টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। জগন্নাথপুর উপজেলার ৪৭টি প্রকল্পের মধ্যে ৪১টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৯১টি প্রকল্পের মধ্যে শুরু হয়েছে ৯০টি প্রকল্পের কাজ। ছাতক উপজেলার ৩৭টি প্রকল্পের মধ্যে ২৯টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলার ৮৯টি প্রকল্পের মধ্যে শুরু হয়েছে ৬৪টি প্রকল্পের কাজ। দিরাই উপজেলার ১৭৯টি প্রকল্পের মধ্যে ১২৬টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। আর শাল্লা উপজেলার ১৯৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৩২টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। গেল রোববার পর্যন্ত ২৫ পার্সেন্ট কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে পাউবো সূত্র জানিয়েছে। এদিকে, তাহিরপুর উপজেলায় এ পর্যন্ত ৭১টি প্রকল্পের, শাল্লা উপজেলায় ৬৫টি প্রকল্পের, দিরাই উপজেলায় ৫৩টি প্রকল্পের ও ধর্মপাশা উপজেলায় ৪৫টি প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেনি পাউবো। ১২ উপজেলার মধ্যে শুধুমাত্র এই চার উপজেলায় কাজ শুরু না হওয়া প্রকল্পের সংখ্যা ২৩৪টি। অথচ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিধান অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করতেই হবে।

এদিকে, চলতি মৌসুমে হাওরের বাঁধ মেরামতের জন্যে ২০৩ কোটি টাকা চাহিদা দেয়া হয়। চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০০ কোটি টাকা। বরাদ্দ থেকে গত ২০ নভেম্বর রোববার ২৫ কোটি টাকা ছাড় দেয় পাউবো সদর দপ্তর। এরপর আর কোনো অর্থ ছাড় না দেয়ায় আজ পর্যন্ত অনেক পিআইসি প্রথম কিস্তির টাকা পায়নি। টাকা না পাওয়ায় অনেক প্রকল্পে মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত এস্কেভেটর মেশিন, ট্রাকসহ শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। বৃষ্টি শুরুর আগে কাজ সম্পন্ন করা গেলে বাঁধ শক্তিশালী হয়। আর তাড়াহুড়ো করে বাঁধ মেরামত করা হলে বাঁধের ঝুঁকি থেকেই যায়। এবার হাওরের ফসল রক্ষার বাঁধ মেরামতের কাজে সময়মতো অর্থ না পেলে কাজ বিলম্বিত হওয়ারও নানা শংকা রয়েছে বলে স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়। আগামী এক সপ্তাহে শতভাগ আবাদ হয়ে যাবে। আবাদকৃত জমি থেকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকারও বেশি। গত মৌসুমে (২০২১-২০২২ অর্থ বছরে) জেলায় ৫২০ কিলোমিটার বাঁধ মেরামতে ৭২২টি পিআইসি গঠন করা হয়েছিল। বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল ১২২ কোটি টাকা। কিন্তু উজান থেকে আসা পাহাড়ী ঢলের পানিতে ৩১টি হাওরের ২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন ধান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ধানের বাজার মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে ৭৮০টি পিআইসির মাধ্যমে ৬১৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। এতে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল ১২৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে ৭৪৫টি পিআইসি দিয়ে ৬৩৩ কিলোমিটার বাঁধের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ওই বছর প্রাথমিকভাবে ১৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে ৪৫১ দশমিক ১৩৮ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ৫৭২টি পিআইসির অনুকূলে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল ৮০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ৯৬৫টি পিআইসির মাধ্যমে নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছিল ১ হাজার ৩৪ দশমিক ৯০০ কিলোমিটার বাঁধ। এতে প্রাথমিকভাবে ১৫১ কোটি ৬৬ লাখ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। ২০১৭ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জের সকল হাওরের ইরি-বোরো ফসল তলিয়ে যায়। ঠিকাদারদের চরম অনিয়ম, কাজ না করে বিল তুলে নিয়ে যাওয়াসহ পাউবো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জেলায় তুমুল আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সুনামগঞ্জে ছুটে আসেন। ওই সময়ের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ঠিকাদারী প্রথাকে বাতিল করে হাওর এলাকায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত, নদী/খাল পুনঃখননের জন্য স্কীম প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে- কাবিটা নীতিমালা -২০১৭ প্রণয়ন করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। ওই বছর থেকেই প্রথম বারের মতো কাবিটা নীতিমালা -২০১৭ অনুযায়ী পাউবো বাঁধের কাজ শুরু করে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন :

সর্বশেষ সংবাদ

ukbanglaonline.com