ইউকে রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
হেডলাইন

মৃত্যুর মিছিলে ভোটের স্লোগান

মৃত্যুর মিছিলে ভোটের স্লোগান

মৃত্যুর মিছিলে ভোটের স্লোগান

সিলেট সংবাদদাতা : ‘রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল’-এই ঐতিহাসিক গল্পটি প্রায় সবারই জানা। রোমের সেই কুখ্যাত ইতিহাসিক গল্পের মতো একটি গল্পের সাক্ষী হতে যাচ্ছে প্রিয় বাংলাদেশে। বৈশ্বিক মহামারী করোনায় যখন দেশ বিপর্যস্ত ঠিক তখনই নির্বাচন খেলায় মেতে উঠেছে নির্বাচন কমিশন।

আগামী ২৮ জুলাই আয়োজন করা হয়েছে সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচন। নির্বাচনের জন্য ওইদিন জন্য শিথিল করা হয়েছে সেই এলাকার সরকার আরোপিত ‘কঠোর বিধিনেষেধ’ বা ‘লকডাউন’। নির্বাচনকে ঘিরে গত প্রায় দুই মাস থেকে সেই এলাকায় চলছে জমজমাট প্রচার-প্রচারণা। স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে প্রতিদিনই বিশাল জনসমাগম করে চলছে মিছিল-মিটিং, জনসভা, উঠান বৈঠক আর নানা কৌশলী প্রচারণা। প্রচারণায় যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় থেকে শীর্ষ নেতাকর্মীরা।

ব্যাপক এই জনসমাগমের ফলে সিলেট-৩ আসনে অন্তর্গত দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলাসহ তথা সিলেটজুড়ে দেখা দিয়েছে করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্যমতে, এমনিতেই করোনার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন সীমান্তবর্তী সিলেটে জেলা। এর মধ্যে এই আসনে উপনির্বাচনে ব্যাপক জনসমাগম, অবাধে যাতায়াত ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারনে এই তিন উপজেলায় করোনা সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গ্রামে-গ্রামে মানুষের মধ্যে জ্বর-কাশিসহ করোনার উপসর্গ দেখা দিয়েছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে মারাও যাচ্ছেন অনেকে। এই অবস্থায় নির্বাচন হলে সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে।

নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে রোববার (২৫ জুলাই) রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যান সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও সিলেট-৩ আসনের রির্টানিং কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হোসেন। শরীরে তীব্র জ্বর নিয়েও তিনি নির্বাচনী কার্যক্রমের জাতীয় দায়িত্ব পালন করে গেছেন জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। এর আগে গত ৭ জুলাই মো. হোসেনের সহধর্মিণী স্বামীর করোনা আক্রান্তের কথা নিশ্চিত করে জানান, তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি আছেন। নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেদিন সিলেটের আরও ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন।

মো. ইসরাইল হোসেন ছাড়াও করোনায় আক্রান্ত হন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সিলেটের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সল কাদের ও অতিরিক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা শুকুর মাহমুদ, বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন ও জৈন্তাপুর নির্বাচন কর্মকর্তা আবুল হাসনাতসহ কয়েকজন।

মো. ইসরাইল হোসেনের মৃত্যুতে প্রশ্ন উঠেছে দেশব্যাপী করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতির সংকটময় সময়ে তড়িঘড়ি করে নির্বাচন আদৌ কতটা যৌত্তিক? জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহাদুর্যোগ ‘মহামারী’র মধ্যে নির্বাচন কমিশন কেন নির্বাচন স্থগিত করেনি বা পিছিয়ে নেয়নি তা নিয়ে এই প্রশ্ন তুলেছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন কমিশন ভোটারবিহীন নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্যই লকডাউনের মধ্যে এই নির্বাচনের আয়োজন করছে দাবি করে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানে বলা আছে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন করতে হয়। তবে দৈব-দুর্বিপাকের কারণে এ সময়ের মধ্যে ভোট করতে না পারলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেও নির্বাচন করা যাবে। এখন যে দৈব-দুর্বিপাক দেশ ব্যক্ত হয়েছে তা সর্বজন স্বীকৃত। এই দৈব-দুর্বিপাকের কারণে ইউপি নির্বাচন পেছানো হলো কিন্তু সংসদ নির্বাচন পেছানো হলো না কেন? নির্বাচনতো আগামী সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখ পর্যন্ত করা যেত।

নির্বাচনের কারণে সৃষ্ট জনসমাগম থেকে করোনায় সংক্রমিত হয়ে মো. ইসরাইল হোসেন কিংবা ওই এলাকায় যারা মারা গেছেন কিংবা মারা যাবেন এই মৃত্যুর দায় কার? অথবা যারা সংক্রমিত হচ্ছেন তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিবেন কে? এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে কথা হয় দেশের প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁর ভাষায়, মানুষের জীবন সবকিছুর আগে। যদি মানুষ না বাঁচে তাহলে আইন-সংবিধান কার জন্য। আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে যুক্তিতে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন তা অগ্রহণযোগ্য। কারণ, দেশে যখন এ রকম একটি মহামারী চলমান থাকে তখন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য যে যে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন যা নেয়াই হলো প্রধান দায়িত্ব। নির্বাচনের কারণে ওই এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে চলছে জনসমাগম, মিছিল-মিটিং। এতে ওই এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে। আগামীতে তা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন এই মৃত্যুরগুলোর দায় কার? সিইসি যেহেতু ওই অঞ্চলে নির্বাচন আয়োজন করেছে, তাই এই দায় কিন্তু তাকেই নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১১ মার্চ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী। এরপর ১৫ মার্চ আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। করোনা মাহামারীর কারনে শূণ্য ঘোষণার প্রথম ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। যার কারণে দ্বিতীয় ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩ এর দফা ৪ শর্তানুসারে সিলেট উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা আগামী সেপ্টেম্বর মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত। এরই মধ্যে চলতি মাসেই ২৮ জুলাই উপ-নির্বাচনের ভোট গ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইতোমধ্যেই সকল প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় চলছে শেষ সময়ের প্রচার-প্রচারণা। তবে সংকটময় সময়ে নির্বাচন আয়োজনে বাদ সাধছেন সচেতন মহল। তারা নির্বাচন পেছানোর জোর দাবি করছেন।

কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণ দেখিয়ে আগামী ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচন আর পেছানোর সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার নির্বাচন পেছানোর আইনের ব্যাখা সঠিক নয় বলে দাবি করছেন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ আইনজীবী। রোববার (২৫ জুলাই) করোনার উর্ধ্বমুখী সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে সিলেট-৩ আসনের উপ-নির্বাচন স্থগিতের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন তারা। ওই ৫ আইনজীবির পক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির নোটিশে বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে চলমান লকডাউনেও নির্বাচন স্থগিত রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৩ এর দফা ৪ শর্তানুসারে সিলেট উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত।

দীর্ঘ ১৬ মাসের বেশি সময় থেকে করোনার সঙ্গে লড়াই করতে করতে পুরো দেশ এখন ক্লান্ত। প্রতিদিন মৃত্যু আর শনাক্তের মিছিল বার্তা দিচ্ছে আমার গভীর থেকে গভীরতর সংকটের দিকে যাচ্ছি। এই সংকময় সময়ে আমার চাই না নির্বাচন। আমার দেখতে চাইনা ‘মৃত্যুর মিছিলে ভোটের শ্লোগান’। এযাত্রায় বেঁচে গেছে, আগামীতে করতে পারবো নির্বাচনী উল্লাস। সংকটময় সময়ে সিলেটের নির্বাচন স্থগিত কিংবা পিছিয়ে দেয়া- এখন সময়ে দাবি।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন :

‘মুক্তমত’ বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব। ‘ইউকে বাংলা অনলাইন ডট কম’ সকল মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে ‘মুক্তমত’ বিভাগে প্রকাশিত লেখার দায় ‘ইউকে বাংলা অনলাইন ডট কম’ এর নয়। - সম্পাদক

সর্বশেষ সংবাদ

ukbanglaonline.com