ইউকে সোমবার, ২ আগস্ট ২০২১
হেডলাইন

কবে শেষ হবে ঝুমনের কারাবাস?

কবে শেষ হবে ঝুমনের কারাবাস?

কবে শেষ হবে ঝুমনের কারাবাস?

জ থেকে তিন মাস আগে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব দেখেছিলেন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামবাসী। এই নোয়াগাঁও হিন্দুদের গ্রাম বলে পরিচিত। গত ১৭ মার্চ সেখানে বসবাসকারী হিন্দুদের ৮৫টি বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। ভাঙচুর করা হয় মন্দির, উপড়ে ফেলা হয় গ্রামের নলকূপ। খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়, তাই সবারই মনে থাকার কথা। যদিও এরপর দেশে ঘটেছে নানা আলোচিত ঘটনা, এক ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়েছে আরেক ইস্যু।

সেই তিন মাস আগের ঘটনা আজ অবতারণা করার কারণ লুণ্ঠিত নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক ঝুমন দাস আপন। এই নামটিও আমাদের কারও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ঝুমনের দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করেই ঘটেছিল সেই তাণ্ডবের ঘটনা। গত ১৫ মার্চ দিরাইয়ে সমাবেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরোধীতার পাশাপাশি হিন্দুদের সমালোচনা করেন হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক। এ ঘটনায় মামুনুলের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেন ঝুমন দাস আপন। পরদিন ১৬ মার্চ তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওইদিন রাতেই দিরাই উপজেলার নাচনি, চণ্ডিপুর, সরমঙ্গল, সন্তোষপুর, ধনপুর এবং শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের মসজিদে ধর্ম অবমানার অভিযোগ এনে আন্দোলনের ডাক দেন হেফাজতের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। রাতে তারা নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা করতে উদ্যত হলে প্রশাসন তাদের সামাল দেয়। তবে পরদিন ১৭ মার্চ সকালে ৬টি মসজিদ থেকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে মাইকিং করেন হেফাজত নেতারা। ৬টি গ্রামের হাজারও মানুষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সকালে হামলা চালায় নোয়াগাঁও গ্রামে। হামলাকারীরা ফেসবুকে লাইভ দিয়ে হামলায় অংশ নেয় এবং হাজারও মানুষের উপস্থিতি দেখায়। তারা মামুনুল, বাবুনগরী ও হেফাজতের অ্যাকশন বলে স্লোগান দিয়ে হামলায় অংশ নেয়। এর আগে ১৬ মার্চ রাতে কটূক্তির অভিযোগে ঝুমনকে আটক করে পুলিশ। ১৭ মার্চ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত সেদিন তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন।


ঝুমন যদি মামুনুলকে কটাক্ষ বা তার সমালোচনা করেই থাকেন, তাহলে কি ভুল কিছু করেছেন? মামুনুল তো দেশজুড়েই সমালোচিত এক ব্যক্তি। পুলিশি রিমাণ্ডে বের হয়ে এসেছে তার সব কুকর্মের কথা। এ রকম একজন অপরাধীর সমালোচনা তো সবারই করা উচিত, যেটা বেশ আগেই করে ফেলেছেন ঝুমন। তাহলে এই সমালোচনার ‘অপরাধে’ ঝুমন কেন জেলে থাকবেন?


গত ২৭ মে নোয়াগাঁওয়ে তাণ্ডবের ঘটনার এজাহারভুক্ত ১৮ আসামি জামিন পেয়েছেন। এর মধ্যে ১৬ আসামি স্বেচ্ছায় আদালতে হাজির হন এবং দুই আসামি কারাগারে ছিলেন। সর্বশেষ আজ (২১ জুন) জামিনে মুক্তি পেলেন নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার ঘটনার মূল আসামি ইউপি সদস্য ও যুবলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম স্বাধীন। ভয়াবহ তাণ্ডবের মূল হোতা স্বাধীন জেল থেকে ছাড়া পেলেও ছাড়া পাননি ঝুমন। বার বার নাকচ হয়েছে তার জামিন আবেদন। যে মামুনুল হককে ‘কটূক্তি’ করার কারণে কারাগারে আছেন ঝুমন, সেই মামুনুল নিজেই রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে আছেন কারাগারে। ইতোমধ্যে জানা গেছে মামুনুল হেফাজতের নেতা হিসেবে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন, ওয়াজের মাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়াতেন তিনি। এমনকি তার বিরুদ্ধে হয়েছে ধর্ষণের মামলাও।

এখন কথা হচ্ছে, ঝুমন যদি মামুনুলকে কটাক্ষ বা তার সমালোচনা করেই থাকেন, তাহলে কি ভুল কিছু করেছেন? মামুনুল তো দেশজুড়েই সমালোচিত এক ব্যক্তি। পুলিশি রিমাণ্ডে বের হয়ে এসেছে তার সব কুকর্মের কথা। এ রকম একজন অপরাধীর সমালোচনা তো সবারই করা উচিত, যেটা বেশ আগেই করে ফেলেছেন ঝুমন। তাহলে এই সমালোচনার ‘অপরাধে’ ঝুমন কেন জেলে থাকবেন? কেন বার বার আদালতে নাকচ হচ্ছে তার জামিনের আবেদন? নোয়াগাঁও গ্রামে তাণ্ডবকারীরা একে একে জামিনে ছাড়া পাচ্ছে, অথচ ঝুমনের জামিন মিলছে না। এটি কি সত্যিই ন্যায়বিচার?

ঝুমন দাসের মা নিভা রাণী দাস অপেক্ষায় আছেন ছেলের। ঝুমনের স্ত্রী সুইটি রাণী দাস আছেন নিরাপত্তাহীনতায়। সেই নিরাপত্তাহীনতার কথা অনেক আগেই তিনি জানিয়েছেন প্রশাসনকে। এখন আবার নোয়াগাঁও তাণ্ডবের আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে আশপাশে। ফলে বেড়েছে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা। ওই গ্রামে হেফাজতের হামলার দিন ভেঙে দেওয়া হয়েছিল সুইটির হাত। তার কোলের শিশু সৌম্য’র বয়স তখন মাত্র ৯ মাস। এতদিনে সেই শিশুটির বয়স হয়তো ১ বছর পেরিয়েছে। তার জীবনের ১ম জন্মদিনটিও হয়তো চলে গেছে বাবার স্পর্শহীনতায়!

অনেক তো হলো, এবার ঝুমনকে মুক্তি দিন। চিহ্নিত একজন অমানুষের সমালোচনা করায় একটা মানুষকে দীর্ঘ দিন ধরে জেলে পুরে রাখা হয়েছে- এটা আপনাদের কেমন বিচার?

  • রাজীব রাসেল। সাংবাদিক।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন :

সর্বশেষ সংবাদ

ukbanglaonline.com