
ইউকে বাংলা অনলাইন ডেস্ক :২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশজুড়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের তীব্রতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস ছিল এক প্রতিকূল ও উত্তাল অবস্থায়। ‘রাজাকার’ স্লোগানে প্রতিবাদের অগ্নিগর্ভ সেই রাতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ঢাবির তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন আলাপ হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চানখারপুল গণহত্যা মামলার চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ওই ফোনালাপের লিখিত বিবরণ আদালতে উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, আলাপচারিতার এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে অভিহিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেন।
ফোনালাপে মাকসুদ কামাল শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন, ‘প্রত্যেক হল থেকে ছেলেমেয়েরা তালা ভেঙে বের হয়ে গেছে, রাজু ভাস্কর্যে ও মল চত্বরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী জমায়েত হয়েছে এবং যেকোনো সময় তার বাসায় আক্রমণ হতে পারে।’ 이에 শেখ হাসিনা বলেন, ‘তোমার বাসার নিরাপত্তার জন্য আমি ব্যবস্থা নিয়ে দিয়েছি।’
মাকসুদ কামালের ‘জি জি’ সাড়া পাওয়ার পর শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগে একবার ব্যবস্থা নিতে হবে।’ এরপর মাকসুদ কামাল জানান, ‘তাদের মধ্যে লাঠিসোঁটা নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি চলছে।’ শেখ হাসিনা তৎক্ষণাৎ সতর্ক করেন, ‘লাঠিসোঁটা নিয়ে বের হওয়া যাবে না, পুলিশ ও বিজিবি অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। তারা রাজাকার হতে চাইছে, সবাই রাজাকার।’
মাকসুদ কামাল পুনরায় নিশ্চিত করেন, ‘আমরা সবাই রাজাকার বলছি।’ এরপর শেখ হাসিনা কড়া ভাষায় বলেন, ‘তো রাজাকারদের তো ফাঁসি দিয়েছি, এবার তোমাদেরও ফাঁসি দিবো, একটাও ছাড়ব না। এতদিন ধৈর্য ধরছি, কিন্তু তারা আরো বাড়ছে।’
এ সময় মাকসুদ কামাল ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা আরও বাড়ানোর অনুরোধ জানান এবং বলেন, ‘আমার বাসার আশপাশেও নিরাপত্তা বাড়াতে হবে।’ শেখ হাসিনা আশ্বস্ত করেন যে ক্যাম্পাসে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং বাসায় লোক রাখতে বলা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, মাকসুদ কামাল বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতারা আমার বাসায় ছিল এবং তারা ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগকে সংগঠিত করে রাখছে, যা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর একত্রিত হওয়ার কারণ হয়েছে।’
এ পর্যায়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কোন দেশে বাস করছি? রাজাকারদের কী অবস্থায় ফেলেছি, তাদের সবাইকে ফাঁসি দিয়েছি, এবার তোমাদেরও ছাড়ব না।’
মাকসুদ কামাল যোগ করেন, ‘আমি যারা এই অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তাদের ইউনিভার্সিটি থেকে বহিষ্কার করব।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘অস্থিরতা সহ্য করার পর গ্রেপ্তার ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইংল্যান্ডেও ছাত্ররাজনীতির জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
মাকসুদ কামাল ‘জি জি জি’ বলে সম্মতি দেন এবং শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই অ্যাকশন ছাড়া অন্য উপায় নেই, এত সহনশীলতা দেখানো হয়েছে।’
মাকসুদ কামাল ছাত্রলীগকে সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা কোনো অবৈধ কার্যক্রম করো না, আদালত বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।’
তখন শেখ হাসিনা বলেন, ‘না, তারা ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে।’
মাকসুদ কামাল বলেন, ‘রাষ্ট্রপতিকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া যায় না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতিকে এমন আলটিমেটাম দেওয়া এক সীমারেখা লঙ্ঘন।’
মাকসুদ কামাল আশ্বাস দেন, ‘যদি কোনো খারাপ কিছু ঘটে আমি জানাবো, তবে রাতের বেলায় না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো অসুবিধা নেই, আমি সবসময় ফ্রি আছি।’
ফোনালাপ শেষ হয় মাকসুদ কামালের ‘জি জি জি, সালামু আলাইকুম’ দিয়ে।
এই ফোনালাপ থেকে স্পষ্ট যে আন্দোলন দমন ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা তখন থেকে গৃহীত হয়েছিল এবং উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।