ইউকে বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
হেডলাইন

পিরিয়ড নিয়ে কিশোরীদের বাড়ছে সচেতনতা

পিরিয়ড নিয়ে কিশোরীদের বাড়ছে সচেতনতা

ইউকে বাংলা অনলাইন ডেস্ক :একটা সময় ছিল, পিরিয়ড বা ঋতুকালে নারীদের অশুচি মনে করা হতো। ব্যাহত হতো তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এমনকি অফিস বা কর্মস্থানেও নারীদের পিরিয়ড নিয়ে ছিল নানা কটাক্ষ বা হাস্যকর মন্তব্য। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস অনেকটাই কেটে গেছে। বদলে গেছে মানসিকতাও।

পিরিয়ড নারীর জীবনের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় এক প্রক্রিয়া। এটা একজন নারীকে সন্তানধারণে সক্ষম করে তোলে। এটা কোনো সংকোচের বিষয় নয়, বরং এ সময়ে নারীদের প্রয়োজন বাড়তি যত্ন ও সবার সহযোগিতা। পিরিয়ড সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ২৮ মে পালন করা হয় বিশ্বমাসিক স্বাস্থ্য দিবস।

ঋতুকালীন সচেতনতা ও সুযোগ-সুবিধা

ঋতুকালে বা পিরিয়ড চলাকালে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের দেশের নারীরা ঠিক কতটা সচেতন? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজেন সার্ভে ২০১৮ অনুসারে, প্রায় ৫০ শতাংশ কিশোরী স্যানিটারি ন্যাপকিনের পরিবর্তে অস্বাস্থ্যকর পুরনো কাপড় ব্যবহার করে।

পিরিয়ডের সময় এখনো অনেক কিশোরী স্কুলে যায় না এবং ক্ষেত্রবিশেষে পরীক্ষায়ও অংশ নেয় না। কারণ দেশের বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঋতুকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাবান্ধব টয়লেট নেই। টয়লেটগুলোতে জরুরি স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের সুযোগ থাকে না এবং ব্যবহৃত ন্যাপকিন ফেলার স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাও থাকে না। অথচ গড়ে একজন শিক্ষার্থী পিরিয়ডের সময় ৭-৮ ঘণ্টা স্কুলে থাকে। সে জন্য স্কুলগুলোতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের সুযোগ থাকা জরুরি এবং তা ফেলার স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা থাকাও দরকার।

এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ নারীর পিরিয়ড হয়। তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগামী কিশোরী। এর মধ্যে দেশের ৭১ শতাংশ নারী এখনো পিরিয়ড চলাকালীন পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতন নন। সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক সংস্কারের কারণে তারা এ বিষটি নিয়ে এখনো খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন না। এতে তারা নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হন এবং অজ্ঞতার কারণে নানা রকম রোগসহ গর্ভধারণে নানা জটিলতায় পড়েন বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

বিবিএস, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং ওয়াটার এইডের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ ‘ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভে’র প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সচেতনতার অভাব আর উপকরণের দাম হাতের নাগালের বাইরে হওয়ায় দেশের ৭১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী এখনো পিরিয়ডের সময় ডিসপোজেবল প্যাড ব্যবহার করেন না। তারা প্যাডের পরিবর্তে পুরনো-অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করে নানা সংক্রমণ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

বাড়ছে সচেতনতা

তবে বাংলাদেশে মাসিক সচেতনতা বিষয়ে কাজ চলছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের আরবান প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর ডমিনেক সেন্টু গমেজ বলেন, ২০২১ সাল থেকে আমরা পিরিয়ড বা মাসিককালীন পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে কাজ করে আসছি। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উদ্যোগে সারাদেশের বায়ান্নটা উপজেলায় এরিয়া প্রোগ্রামের ভিত্তিতে স্কুলগুলোতে মিন্সট্রুয়াল হাইজিন বা ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মেয়েদের সচেতন করা হয়।

টঙ্গী ও ঢাকার যে চারটি কর্ম এলাকায় আমাদের যে অফিসগুলো আছে তার আন্ডারে ৩০টা স্কুলে আমরা এ কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এ প্রোগামে স্কুলগুলোতে একটা করে হেল্প কর্নার আছে। যেখানে পিরিয়ডের জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম রাখা থাকে। যেমন- সেনেটারি প্যাড, হাত ধোয়ার জন্য সাবান, টিস্যু এবং অন্য যা কিছু লাগে। কর্নারের তত্ত্বাবধানে থাকেন একজন করে শিক্ষক। যার কাছে চাওয়া মাত্রই মেয়েরা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস পেতে পারে।

স্কুলগুলোতে আমাদের প্রতিনিধি প্রতি মাসে এ বিষয়ে সেশন করায়। প্রতি সেশনে ২০ জন করে ছাত্রী অংশগ্রহণ করে। বছরে ২৬টা সেশন করা হয়। এতে মোট ৫২০ জন করে এই ট্রেনিংয়ের আওতায় চলে আসে। বর্তমানে ৮৮৩৩ জন ছাত্রী এই কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ছাত্রীদের পিরিয়ড বিষয়ে ট্যাবু নিয়েও আলোচনা করা হয়।

জানানো হয়, পিরিয়ড কোনো লজ্জার বিষয় না, এটা একটা স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। এটা নিয়েই স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায়। পিরিয়ড নিয়ে আগে নানা রকম সংস্কার ছিল বা এখনো কিছু আছে। সেই ট্যাবুও এখন অনেকটাই ভেঙে গেছে। এ মেয়েরা আগে পিরিয়ড হলে বলতেই পারত না। অনেক সময় স্কুলে আসত না। কেউ কেউ পরীক্ষাও দিতে পারত না। কিন্তু এখন তারা পিরিয়ড হলে খুব স্বাভাবিকভাবে সেটা তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে শেয়ার করে। এমনকি পুরুষ শিক্ষককেও প্রয়োজন হলে বলতে পারে।

আমরা তো সব স্কুলে এই সাপোর্ট দিতে পারব না। আমরা চেষ্টা করছি ছাত্রী ও শিক্ষকদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে। আমরা চাই অন্য স্কুলগুলো তাদের দেখে এ উদ্যোগ গ্রহণ করুক। এতে আসলে ব্যয় খুব বেশি না। বরং এটুকু সাপোর্ট পেলে আমাদের শিক্ষার্থীরা যারা আগামীদিনে দেশের দায়িত্ব নেবে, তাদের পড়াশোনার ভিত শক্ত হবে। আমাদের ইচ্ছা আছে শিগগিরই আরও ১৬টি স্কুলে এ কার্যক্রম শুরু করার।

প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা

ঋতুকালে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে নানা ধরনের সংক্রামক রোগ হতে পারে। এ বিষয়ে কথা হয় বারডেম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিন্সট্রুয়াল হাইজিন বা পিরিয়ড বিষয়ে এখন সচেতনতা খানিকটা বেড়েছে।

এখনকার মেয়েরা একই কাপড় বারবার ব্যবহার না করে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছে। তার পরও অনেক কিছুই জানার আছে। প্রথমেই মনে রাখতে হবে, পিরিয়ডের সময় অবশ্যই পরিষ্কার প্যাড এবং অন্তর্বাস ব্যবহার করতে হবে। একটা প্যাড চার ঘণ্টার বেশি সময় ব্যবহার করা উচিত না। চার ঘণ্টা পর পর প্যাড বদলে নিতে হবে। প্যাড বদলানোর আগে অবশ্যই যৌনাঙ্গ ভালো করে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিতে হবে।

যৌনাঙ্গ পরিষ্কার করতে সুগন্ধি সাবান ব্যবহার না করাই ভালো। বরং হালকা গরম পানিতে কয়েক ফোঁটা জীবাণুনাশক বা ডেটল- স্যাভলন মেশানো যেতে পারে। পিরিয়ড চলাকালে নিয়মিত গোসল করতে হবে। প্রয়োজনে দিনে দুইবারও করা যেতে পারে। ব্যবহারের পোশাক অবশ্যই গরম পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকাতে হবে। আর যারা পিরিয়ডে কাপড় ব্যবহার করেন তারা ব্যবহারের পর কাপড় ভালো করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিন।

এগুলো মেনে না চললে নানা রকম সংক্রামক রোগ হতে পারে। যেমন- সাদা স্রাব হতে পারে। যদিও অল্প সাদা স্রাব হলে তেমন সমস্যা নেই। কিন্তু যখন এটা রেগুলার বেশি পরিমাণে হবে, তখন অবশ্যই এটা রোগ। একে লিউকোরিয়া বলা হয়। একই প্যাড বেশি সময় পরে থাকলে জ্বালাপোড়া, চুলকানি ও র‌্যাশ হতে পারে। কেউ কেউ আবার পিরিয়ডের শুরুর দিকে সতর্ক থাকলেও শেষের দিকে ততটা গুরুত্ব দেন না। এটা করা যাবে না।

একটা প্যাড বেশি সময় পরে থাকলে ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা যৌনাঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হতে পারে। তখন ঐ জায়গায় জ্বালাপোড়া ও র‌্যাশ হয়। এ ছাড়াও মূত্রনালির সংক্রমণ ও প্রস্রাবের ইনফেকশনও হতে পারে। তখন প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, তলপেটে ব্যথা এবং যোনিতে খুব দুর্গন্ধ হতে পারে। এ ছাড়াও পিরিয়ডের রক্ত অনেক সময় ধরে প্যাডে লেগে থাকলে খুব বাজে একটা গন্ধ হয়। তাই এ সময়টায় মেয়েদের সুস্থ থাকার জন্যই পরিষ্কার থাকা খুব দরকার।

যত্ন নিতে হবে মানসিক স্বাস্থ্যের

পিরিয়ড চলাকালে নারী শরীরে হরমোনাল পরিবর্তন হয়। এই হরমোন পরিবর্তনের কারণেই ঐ সময়ে নারীদের মুড সুইং হয়। এ বিষয়ে কথা হয় ডা. সন্তোষ কুমার দত্ত, এমবিবিএস, এমপিএইচ, টেকনিক্যাল ম্যানেজার, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কর্মসূচি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ এর সঙ্গে।

তিনি বলেন, এ সময়ে মেয়েদের কিছু আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন- অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া, হঠাৎ রেগে যাওয়া, মেজাজ খিটমিটে হওয়া, হতাশ হওয়া, অস্থিরতায় ভোগা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কারো কারো নিজের প্রতি ঘৃণার জন্ম নিতে পারে। নিজেকে অশুচি মনে করে। এটা হয় সামাজিক ট্যাবু থেকে। কারণ তাকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়। আবার অনেকের শারীরিক কিছু সমস্যাও হতে পারে। যেমন- মাইগ্রেন, বমিভাব, খাবারে অরুচি, তলপেটে ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। কারো কারো ব্যথা বেশি হয়। তাকে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দেওয়া যেতে পারে।

এ সময়ে অনেকের আবার মানসিক পরিবর্তনও দেখা যায়। যেমন- কথা বলতে ইচ্ছা না করা, বেশি কথা শুনতে বিরক্ত লাগা, বেশি লোকজনের মধ্যে যেতে ইচ্ছা না করা বা একা থাকতে ইচ্ছা করা। এ সমস্যাগুলো বয়ঃসন্ধিকালে বেশি হয়। পরবর্তীতে অনেকেই আবার অ্যাডজাস্ট করে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনা। আর পরিবারের সদস্যদের সাপোর্টটাও খুব দরকার। এ সময়ে পরিচ্ছন্ন থাকার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার খাওয়াও দরকার। খাবারে প্রোটিন, আয়রণ থাকতে হবে। প্রচুর পানি পাণ করতে হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন :

সর্বশেষ সংবাদ