ইউকে সোমবার, ২ আগস্ট ২০২১
হেডলাইন

কোরবানির পশু জবেহ ও চামড়া ছাড়ানোর পদ্ধতি

কোরবানির পশু জবেহ ও চামড়া ছাড়ানোর পদ্ধতি

কোরবানির পশু জবেহ ও চামড়া ছাড়ানোর পদ্ধতিইউকে বাংলা অনলাইন ডেস্ক : ক্ররবানির ইতিহাস ততোটা প্রাচীন যতোটা প্রাচীন মানব সৃষ্টি কিংবা মানব ধর্মের ইতিহাস। মানুষ সৃষ্টির পর বিভিন্ন যুগে তাদের প্রভু‚ কিংবা সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্টির প্রেক্ষিতে শ্রদ্ধাবনত হয়ে প্রেম ভালবাসা, বিনয় নম্রতা, পূজা অর্চনা কিংবা আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রমাণের জন্য কোরবানি, বলী কিংবা আত্ম-উৎসর্গ করেছেন। মানুষ তাদের আপন কল্পিত দেবদেবির সামনে পশু সমর্পণ ছাড়াও জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি বা করে না। আর এটাই হচ্ছে কোরবানির উচ্চতম বহিঃপ্রকাশ। ইসলামী জিন্দেগীতে এ জীবন দানকে আল্লহ্ তায়ালা তাঁর নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন। এ ধরণের জীবন উৎসর্গ তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্য হারাম ঘোষণা করেছেন।

ইতিহাসের প্রথম কোরবানি হযরত আদম (আঃ) এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানি। আল্লাহ বলেন, “(হে মুহাম্মদ) তুমি এদের কাছে আদমের দুই পুত্রের গল্প যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও। যখন তারা দুইজন আল্লাহর নামে কোরবানি পেশ করল তখন তদের মধ্যে একজনের কাছ থেকে কোরবানি কবুল করা হলো, আর একজনের কাছ থেকে কবুলই করা হলো না। (যার কোরবানি কবুল করা হয়নি) সে বলল! আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করবো। (যার কোরবানী কবুল করা হলো) সে বলল আল্লাহ তায়ালা শুধু মোত্তাকিদের কাছ থেকেই কোরবানী কবুল করেন (সুরা আল মায়েদা আয়াত-২৭)।

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যুগে যুগে নবী রাসুলগণের উপর যত শরীয়ত নাজিল হয়েছে তার সকল শরীয়তেই কোরবানির হুকুম ছিল। এটা ছিল একটা অপরিহার্য ইবাদত। সুরা হজ্জে আল্লাহ রাব্বুল আলআমিন বলেন “প্রত্যেক জাতির জন্যই আমি (পশু) কোরবানির এ নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে করে (সেই) লোকেরা সেসব পশুর উপর আল্লাহ তায়ালার নাম নিতে পারে, যা তিনি তাদের দান করেছেন, তোমাদের মা’বুদ হচ্ছেন একজন, অতএব তোমরা তারই সামনে আনুগত্যের মাথা নত করো। (হে নবী) তুমি আমার বিনীত বান্দাদের সাফল্যের সুসংবাদ দাও (সুরা হজ্জ আয়াত-৩৪)। বিভিন্ন দেশ ও জাতির নবীদের শরীয়তে অবস্থার প্রেক্ষিতে কোরবানির নিয়ম-পদ্ধতি ও খুটিনাটি বিষয় সমুহের ভিন্নতা ছিল তবে পশু কোরবানী শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই করতে হবে এবং করতে হবে তাঁর নাম নিয়েই।

বর্তমানে দুনিয়ার সর্বত্র মুসলমানেরা যে কোরবানী করেন এবং তার ফলে উৎসর্গের যে দৃশ্য পরিলক্ষিত হয় তা প্রকৃতপক্ষে হযরত ইসমাইল (আ.) এর ফিদিয়া। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর পুত্রের উৎসর্গের যে তিতিক্ষা সংঘটিত করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা প্রতি বছর জিলহজ্জ মাসের ১০ হতে ১২ তারিখ পর্যন্ত এ উৎসর্গের স্মরণে আল্লাহর নামে পশু কোরবানী দিয়ে থাকি। এ যেন এক সংকল্প, দৃঢ় বিশ্বাস, আত্মসমর্পন ও জীবন দেয়ার বাস্তব বহিঃপ্রকাশ যে মানুযের কাছে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহর ও তাঁর পথে উৎসর্গীকৃত হওয়া উচিৎ। এটা এ সত্যেরও নির্দশন যে, আল্লাহর ইঙ্গিতে কিংবা আদেশের প্রেক্ষিতে বান্দা তার জীবনের রক্ত পর্যন্ত দিতেও দ্বিধাবোধ করবে না। এ শপথ, আত্মউৎসর্গ ও জীবন বিলিয়ে দেয়ার নাম ঈমান, ইসলাম ও ইহসান। যতোদিন দুনিয়া টিকে থাকবে ততোদিন উম্মতে মুসলিমার মধ্যে এ কোরবানী ফিদিয়া হিসেবে অক্ষুন্ন থাকবে। এভাবে যেন তারা আনুগত্য ও জীবন দেয়ার এ মহান স্মৃতি জাগ্রত রাখতে পারে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এ সুন্নাতকে জারি রাখবেন নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর উম্মতের জীবন দানকারী মুমিনগণ।

আল্লাহ রব্বুল আলআমিন বলেন “বল (হে মুহাম্মদ (সঃ)) আমার নামাজ, আমার কোরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সবকিছু আল্লাহ রব্বুল আলআমিন এর জন্য। তাঁর কোন শরিক নেই, আমাকে তারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমি সকলের আগে তাঁর অনুগত ও ফর্মাবরদার” (সুরা আন্ আম আয়াত-১৬২-১৬৩)।

কোরবানীর পশু জবেহ এবং চামড়া ছাড়ানো পদ্ধতি সম্পর্কে এখন কিছুটা আলোকপাত করছি। কোরবানীর পশু জবেহ করার জন্য পশুকে এমনভাবে শোয়াতে হবে যেন তা কিবলামুখী হয়। যথাসম্ভব কোরবানীর পশু নিজে জবেহ করবেন। কোন কারণে নিজে জবেহ করতে না পারলে পশুর নিকট দাঁড়িয়ে থাকবেন। বড় পশুর মধ্যে গরু, মহিষ কিংবা উট এবং ছোট পশুর মধ্যে ছাগল, দুম্বা কিংবা ভেড়া কোরবানীর পশু হিসেবে নির্ধারিত।

  • কোরবানীর পশুকে পুর্বের দিন দানার কিংবা ঘাস জাতীয় খাদ্য কম খাওয়ানো।
  • কোরবানীর দিন পশুকে দানার কিংবা ঘাস জাতীয় খাদ্য না খাওনো।
  • প্রচুর পরিমাণে পানি পান করানো।
  • জবেহের পূর্বে গোছল করানো এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা।
  • পশুকে শোয়ানোর সময় কষ্ট না দেয়া এবং মানবিক আচরন করা।
  • পশুকে জবেহের জন্য ধারালো ছুরি ব্যবহার করা।
  • জবেহের সময় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলা। এছাড়াও নিম্নলিখিত দোয়াও পড়া যেতে পারে-“ইন্নি ওয়াজ্জাহ্তু ওয়াজ হিয়া লিল্লাজি ফাতারাসসামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ আ’লা মিল্লাতি ইব্রাহীমা হানিফাওউ ওয়ামা আনা মিনাল মুসরিকিন, ইন্নাছসালাতি ওয়া নুছুকি ওয়া মাহ্ইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন। লা শারিক কালাহু ওয়াবি জালিকা ওমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন আল্লাহুম্মা লাকা ওয়া মিনকা। অর্থঃ আমি সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ইব্রাহীমের তরিকার উপরে একনিষ্ঠ হয়ে ওই আল্লাহর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করছি যিনি আসমান জমিন পয়দা করেছেন এবং আমি কখনো শিরককারীদের মধ্যে নই। আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবকিছু আল্লাহ রব্বুল আলআমিন এর জন্য। তাঁর কোন শরিক নেই, আমাকে তারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমি সকলের আগে তাঁর অনুগত ও ফর্মাবরদার। হে আল্লাহ এ তোমারই জন্য পেশ করা হচ্ছে এবং এ তোমারই দেয়া (মেশকাত)।
  • জবেহের স্থানে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং দুইটি বড় শিরা (জুগুলার ভেইন) কাটা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হবেন।
  • অযথা এর চেয়ে বেশী না কাটার চেষ্টা করা যেমন- অনেকে জবেহের পর দ্রুত নিস্তেজ হওয়ার জন্য গলার হাড়ের মধ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে খোঁচাতে থাকে। এটা খুবই অন্যায় ও অমানবিক। এতে পশুর অপমৃত্যু হতে পারে।
  • অনেক সময় প্রফেসশনাল কসাইরা ধারালো ছুরি দিয়ে বুকের মধ্যে হৃদপিন্ডে আঘাত করে পশুকে দ্রুত নিস্তেজ করতে চায়। এটাও অন্যায় ও অমানবিক এবং পশুর শরীর থেকে সম্পুর্ন রক্ত বের হতে বাঁধা প্রদান করে। পশু যতটা পা এবং শরীর নাড়াচাড়া করবে তাতে শরীর থেকে সম্পূর্ণ রক্ত বের হতে সহায়ক হবে যেটা অত্যন্ত স্বাস্থ্য সম্মত।
  • জবেহের পর সম্পূর্ণ নিস্তেজ না হওয়া পর্যন্ত চামড়া না ছাড়ানো, অন্ততঃ ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করা।
  • চামড়া ছাড়ানোর সময় চামড়া যাতে কেটে ছিড়ে না যায় সে দিকে লক্ষ রাখা। ধারালো ছুরি ব্যবহার না করে কিছুটা ভোতা ছুরি ব্যবহার করা ভালো।
  • রক্ত ও অন্যান্য বর্জ্য যথাস্থানে ফেলে দেয়া।
  • কোরবানির মাংস কাটার জায়গা পরবর্তীতে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা এবং ব্লিচিং পাউডার কিংবা পটাশ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা।
  • সঠিক পদ্ধতিতে কোরবানীর গোস্ত বন্টন করা।

প্রফেসর ড. এ.টি.এম. মাহবুব-ই-ইলাহী। মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন :

সর্বশেষ সংবাদ

ukbanglaonline.com